কয়েক দিন ধরেই সামাজিক মাধ্যমে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকারের একটি ভিডিও ক্লিপ ঘুরছিল। সাক্ষাৎকারটি ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ঘটনার পর। যেখানে দুই হাজার টাকায় কীভাবে সংসার চালাতেন, সে কথা বলতে শোনা যায় খালেদা জিয়াকে।
সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়েছিল ১৯৮১ সালের জুনে। খালেদা জিয়া তখন ছিলেন নিতান্ত সংসারী এক নারী। ৮০ বছর বয়সে যখন জীবনাবসান হলো, তখন তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও ‘আপসহীন’ উপাধি।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ, যেটির শুরু হয়েছিল দেশের রাজনীতির এক অস্থির সময়ে। ১৯৮১ সালে যে নারীকে সংসারের খরচ আর ছেলেদের পোশাক কেনা নিয়ে হিসাব করতে হতো, ’৮২ সালে রাজনীতিতে পা রেখেই তাঁকে শিখতে হয় দাবার চালের মতো জটিল হিসাব। মোকাবিলা করতে হয় দলের ভাঙন ও এক স্বৈরশাসককে।

খালেদা জিয়ার এই রাজনৈতিক যাত্রার শুরুটা দেখা যাক ১৯৮১ সাল থেকে। ওই বছরের ৩০ মে চট্টগ্রামে কিছু বিশৃঙ্খল সামরিক কর্মকর্তার হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের পর যিনি দেশকে স্থিতিশীল করেছিলেন, সেই জিয়াউর রহমান রেখে যান একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠাতাবিহীন হয়ে পড়া বিএনপিকে।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, পরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৮২ সালের মার্চে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। জারি করেন সামরিক আইন। এই অস্থির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো যখন টিকে থাকার লড়াই করছে, ঠিক সেই সময় খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান।
মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘বিএনপি সময়-অসময়’-এর তথ্য অনুযায়ী, জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারপারসনের পদটি শূন্য ছিল। আবদুস সাত্তারকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। পরে তিনিই পুরোদস্তুর চেয়ারম্যান হন। খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেন। তখন তিনি শুধু বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। তাঁর প্রথম বড় কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ঘটনাটি ছিল ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি। শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ভোরবেলায় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় গণগ্রেপ্তার। নিষিদ্ধ করা হয় রাজনৈতিক তৎপরতা। এর মাঝেই ১৯৮৩ সালে বিএনপিতে প্রথম দফায় ভাঙন শুরু হয়।
খালেদাকে বহিষ্কার
‘বিএনপি সময়-অসময়’ বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, দলটি মূলত টিকে ছিল জিয়াউর রহমানের প্রবল ব্যক্তিত্বের কারণে। তাঁর মৃত্যুর পর দলের নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুস সাত্তারের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম। খালেদা জিয়া তখন ১৯৮৩ সালের মার্চে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। একই সময়ে বিএনপি ভাঙার প্রথম কাঠিটি নাড়েন জিয়াউর রহমান সরকারের সাবেক তথ্যমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী এম এ মতিন। তারা আরও কয়েকজনকে নিয়ে বিএনপির একটি কমিটি করেন।
রাজধানীর মিরপুরে বিউটি সিনেমা হলের সামনে বিএনপির নামে সম্মেলন ডেকে চেয়ারম্যান সাত্তার ও ভাইস চেয়ারম্যান খালেদা জিয়াকে বহিষ্কার করেন। ওই সম্মেলনে হুদা ও মতিনকে যথাক্রমে চেয়ারম্যান ও মহাসচিব করা হয়। গণমাধ্যমে তখন এই বিএনপি হুদার বিএনপি নামে পরিচিতি পায়। পরে তারা এরশাদের তৈরি ‘জনদল’-এ যোগ দেন।

একই বছর বিএনপির তৃতীয় সারির নেতা খালেকুজ্জামান দুদু এবং শেখ শওকত হোসেন নিলু বিএনপির নামে আরেকটি কমিটি গঠন করেন। এই দল পরিচিতি পায় বিএনপি (দুদু-নিলু) নামে। পরে তারা নাম পাল্টে রাখেন প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল। অন্যদিকে বিচারপতি সাত্তার খালেদা জিয়াকে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করেন। সাত্তারের নেতৃত্বাধীন কমিটি মূলধারার বিএনপি হিসেবে পরিচিতি পায়। মূলত তখন থেকেই খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসেন; দলের সর্বসাধারণের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ বাড়তে থাকে।
সমন্বয়ক খালেদা জিয়া
১৯৮৩ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে বেগবান হয়, বিএনপি তখন সাতদলীয় জোট গঠন করে। এর সমন্বয়ক মনোনীত হন খালেদা জিয়া। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ গঠন করে ১৫ দলীয় জোট। এই দুই জোটের মধ্যে ১৯৮৩ সালের ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক সভা হয়। যেখান থেকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেটিই ছিল প্রথম কোনো যুগপৎ আন্দোলন, যা শুরু হয় ৬ সেপ্টেম্বর থেকে।
বিএনপিতে খালেদা জিয়ার আরেক দফায় পদোন্নতি হয় ১৯৮৪ সালের ১ এপ্রিল। সেদিন দলটির বর্ধিত সভায় খালেদা জিয়া ভাষণ দেন এবং তাঁকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। তাঁর প্রথম রাজনৈতিক দৃঢ়তা সামনে আসে এরশাদ সরকারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের বিরোধিতার মাধ্যমে।

মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, সাত দলের পক্ষে খালেদা জিয়া বরাবরই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর ধারণা ছিল, এরশাদের পতনের অন্যতম পথ হতে পারে সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। কিন্তু বিপত্তি তৈরি হয় জোটের দুটি দল নির্বাচনের পক্ষ নিলে। এ অবস্থাতেও খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিপক্ষে অনড় থাকেন, যা আওয়ামী লীগের ১৫ দলীয় জোট ও বামদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। এমন অবস্থায় শেখ হাসিনাও নির্বাচনবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন।
খালেদা জিয়ার এমন অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তাদের এক মূল্যায়নে লিখেছে, স্বামীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার গ্রহণের পর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া তাঁর আপসহীন অবস্থান ধরে রাখেন। এ কারণে দ্রুতই তাঁর একনিষ্ঠ সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়।
হঠাৎ হাওয়া বদল
১৯৮৫ ও ’৮৬ সালে খালেদা জিয়াকে দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। প্রথমটি ছিল দলের শৃঙ্খলা ধরে রাখা। অন্যটি সামরিক শাসকের অধীনে নির্বাচনের বিরোধিতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগের হঠাৎ সরে যাওয়া।
বিএনপি সময়-অসময়ের তথ্য অনুযায়ী, দলটিতে ভাঙন ধরানোর জন্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বেশ কয়েকজন নেতাকে তাঁর অনুগত বানান। যারা অনুগত হয়েছিলেন তাদের ধারণা ছিল, জিয়াউর রহমানের অনুপস্থিতিতে খালেদা জিয়ার মতো অনভিজ্ঞ নেতৃত্বে বিএনপি শিগগিরই মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে কঠোর হাতে দলের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করেন। ১৯৮৫ সালের ১৫ জুন দল থেকে শাহ আজিজুর রহমান, মওদুদ আহমদ, একেএম মাঈদুল ইসলাম, আবদুল আলীম ও ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরীকে বহিষ্কার করেন।

এর মধ্যেই এরশাদ ১৯৮৬ সালের মার্চে ঘোষণা দেন– ৭ মে জাতীয় নির্বাচন। প্রথমে ১৫ ও সাত দলীয় জোট উভয়ে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তখনও বিরোধিতা অব্যাহত রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বৈরশাসকের অধীনে নির্বাচনবিরোধীদের নেতা হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া। পরে সাত দলের সঙ্গে যোগ দেয় আরও ১৭টি দল। এর মধ্যে ছিল জাসদ (ইনু), ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন), বাসদ (খালেকুজ্জামান)। তারা নির্বাচনের দিন সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়। ৭ মের ভোটে জাতীয় পার্টি ১৫৩ ও আওয়ামী লীগ পায় ৭৬টি আসন।
ভাঙন শেষে প্রধানমন্ত্রী
মহিউদ্দিন আহমদের বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে বিএনপি তৃতীয় দফায় ভাঙনের মুখে পড়ে। দলের মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান জামালউদ্দিন আহমদ ও আবুল হাসনাত এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। খালেদা জিয়া ১৯৮৮ সালের ২১ জুন দলের স্থায়ী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি বাতিল করে আবদুস সালাম তালুকদারকে মহাসচিবের দায়িত্ব দেন।

এর দুই বছর পর ১৯৯০ সালের শেষ দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন ফের জোরদার হয়। ক্ষমতায় থাকতে তখন এরশাদের কোনো একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থন দরকার ছিল। কিন্তু ওই বছরের ১৯ নভেম্বর রাজনৈতিক জোটগুলো পৃথকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরশাদ সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সেনাবাহিনীও তখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দেয়। ৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জয় পায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।